রবিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৩

মুরারি সুর, ফুটবলার তৈরি করার কারিগর





তৈরি করেছেন বহু বহু খেলোয়াড় - প্রশান্ত মিত্র, সুব্রত ভট্টাচার্য, সোমনাথ ব্যানার্জী  থেকে হাল আমলের রহিম নবী - কিন্তু মুরারি’দার প্রশিক্ষক হয়ে যাওয়াটা নেহাতই ঘটনাচক্র, ঠিক কোন নির্দিষ্ট ভাবনা চিন্তার পরিণতি নয়। ১৯৬২-৬৩ সালে শ্যামনগর যুগের প্রতীক ক্লাবের এক ঝাঁক নির্ভর যোগ্য নামী ফুটবলার। মুরারি সুর তখন ক্লাবের একজন সাধারণ খেলোয়াড় মাত্র, ভঁয় পেয়ে পিছিয়ে আসার লোক কোন দিনই নন। তাই একই সঙ্গে তুলে নিলেন ক্লাবের ফুটবল প্রশিক্ষকের দায়িত্বও। মুরারি দার বয়স তখন মাত্র ২১-২২ বছর। জন্ম এই শ্যামনগরে ১৩ই আগস্ট ১৯৪১ সালে। প্রথম খেলা শেখা ‘ধনু দার’ কাছে নবীন সংঘে। ধনু’দা কোন নামকরা খেলোয়াড় ছিলেন না, পেশায় শিক্ষাবিদ এই মানুষটি আজীবন ছোটদের খেলাধুলায় উৎসাহ দিয়ে এসেছেন।
 মুরারি সুর খুব ভালো অ্যাথেলিট ছিলেন-  অল ইন্ডিয়া ন্যাশানাল মিটে (১৯৬৪) হার্ডলসে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। ভাল ভলিবলও খেলতেন কিন্তু ফুটবলই ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। ১৯৫৭ সাল থেকে যুগের প্রতীকে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন। কলকাতায় খেলেছেন অরোরা ক্লাব, বালি-প্রতিভা (১৯৬৪) টালিগঞ্জ অগ্রগামী (১৯৬৯-৭২) উল্লেখ করার মত ঘটনা মুরারি সুর টালিগঞ্জে গোল রক্ষক থাকার সময় ১৯৬৯ সালে তারা আই এফ শিল্ড সেমি ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল কে হারায় এবং ফাইনালে মোহামেডন ক্লাবের কাছে এক গোলে হারে।দল এক গোলে পিছিয়ে যাবার পর মুরারি সুর খেলতে নামেন তার পর মহামেডন আর গোল করতে পারে নি, সেই খেলায় মুরারি সুরের অনবদ্য গোল কিপিং এখনো অনেকের স্মৃতির মণিকোঠায়। মুরারি’দা যখন স্পোর্টিং ইউনিয়নে যোগ দিয়ে ছিলেন তখন এই ক্লাব দ্বিতীয় ডিভিশনে খেলত পরের বছর ১৯৭৪ সালেই তারা প্রথম ডিভিশনে উন্নীত হয়। এই স্পোর্টিং থেকেই ১৯৭৬ সালে খেলোয়াড় জীবন থেকে অবসর নেন।
        ১৯৭৭ সাল থেকে পুরো দস্তুর ফুটবলের প্রশিক্ষণে নেমে পড়া - গারুলিয়া এ সি, ভাতৃ সংঘ কলকাতা, চন্দননগর মিলন সমিতি, চন্দননগর বয়েজ ক্লাব, শান্তিপুর পাঠচক্র ও ভদ্রেশ্বর ন্যাশানাল এথেলেটিক ক্লাবে একটানা ২৫ বছর। এর পাশাপাশি শ্যামনগরের যুগের প্রতীক ক্লাবে দীর্ঘদিন উনি প্রশিক্ষকের দায়িত্বে তো ছিলেনই।
        খেলোয়াড় খুঁজে পেতে ঘসে মেজে তৈরি করা মুরারি সুরের অন্যতম আবেগ । প্রশিক্ষক জীবনে তৈরি করেছেন বহু বহু খেলোয়াড়  প্রশান্ত মিত্র, সুব্রত ভট্টাচার্য, সোমনাথ ব্যানার্জী  থেকে হাল আমলের রহিম নবী। ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ ও শৃঙ্খলা-পরায়ণ মুরারি সুর ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরিতে চাকরি ও ফুটবল খেলার সাথে কোচিং র দায়িত্ব ও সামলাতেন।
        ফুটবল প্রশিক্ষক হিসাবে তাঁর বড় পাওনা নিজের ছাত্রদের ভক্তি, শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি, ‘ফিফা’ তাঁর এই সামগ্রিক কর্ম কাণ্ডের স্বীকৃতি দেয় ২০০১ সালের মে মাসে। সবচেয়ে বড় আঘাত শরীর ও মনের অণু পরমাণুতে জড়িয়ে থাকা ‘যুগের প্রতীক’ ক্লাব ছেড়ে চলে যেতে প্রায় বাধ্য হওয়া। শ্যামনগরের যুগের প্রতীক ক্লাব কলকাতার ময়দানে খেলোয়াড় তৈরির কারখানা হিসাবে পরিচিত ছিল মুরারি সুর চলে যাবার পর সম্ভবত  আর কোন বড় মাপের খেলোয়াড় এই ক্লাব কলকাতার ময়দানে উপহার দিতে পারে নি।  

        সেরিব্রাল অ্যাটাকে বাম অঙ্গ অবশ প্রায়, অল্প কিছু দিন হল দুরারোগ্য ব্যাধিতে অকালে চলে গেছে এক  ছেলে। দমেন নি। এখনও নিয়মিত কোচিং করতে ছোটেন পান্ডুয়া আর ত্রিবেণী সপ্তাহে তিন দিন। তাঁর অশক্ত শরীর কিন্তু শক্তিশালী মন নিয়ে এখনো  খুঁজে চলেন  আরও অনেক প্রশান্ত মিত্র, সুব্রত ভট্টাচার্য, সোমনাথ ব্যানার্জী আর রহিম নবী দের। আরও আরও অনেক দিন সুস্থ থাকুন মুরারি’দা - ফুটবলের প্রয়োজনেই।     

লেখা ও ছবি: দেবাশিষ দাসগুপ্ত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন