শ্যামনগর
আতপুর অঞ্চলে ১৯৩১ সালে কৃষ্ণ চন্দ্র পালের জন্ম, কৃষ্ণ চন্দ্র পাল নামে কেউ হয়ত
চিনবেন না কারণ উনি দেশ জুড়ে পরিচিত ছিলেম কেষ্ট পাল বা কে পাল নামেই। ছোট্ট বয়স থেকেই যুগের পথিক ক্লাবে তার ফুটবল
দক্ষতা বিশেষ করে তার গোল করার দক্ষতা তাকে শ্যামনগরের ক্রীড়া মহলে বিখ্যাত করে
তোলে, তখনকার কলকাতার নামি ক্লাব বেচু দত্ত রায়ের স্পোর্টিং ইউনিয়ন যখন তাকে
কলকাতায় খেলার জন্য নিয়ে যায়, কেষ্ট পালের বয়স তখন ১৯ বছর। কলকাতায় খেলতে গিয়েই
প্রথম বছরেই তিনি স্পোর্টিং ইউনিয়নের হয়ে ৫ টি ম্যাচে ৮ টি গোল করেন।
এবার
তিনি নজরে পড়েন মোহনবাগানের ধীরেন দের, ১৯৫৪ সালে তিনি কেষ্ট পাল কে নিয়ে আসেন
মোহনবাগানে। দেশের অন্যতম সেরা দল, নাম করা ফুটবলার দের সঙ্গে খেলতে তার মধ্যে
একটুও জড়তা দেখা যায় নি বরং ৫৪ সালের লিগ জয়ে তার ভূমিকা ভোলার নয়। মোহনবাগানে তার
সঙ্গে বদ্রু ব্যানার্জীর বোঝাপড়া প্রায় রূপকথার গল্পের মত। এই ৫৪ সালেই মহামেডন
ক্লাব ফয়জুর রহমান, নবাব, লতিফ, আবিদ, রমণ আর নায়ারের মত সেরা খেলোয়াড় নিয়ে এক
দুর্ধর্ষ দল করে, এই বছরে তারা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকে হেলায় হারায়, লিগ জয়ের জন্য
তাদের শেষ বাধা শৈলেন মান্নার অধিনায়কত্বে মোহনবাগান, এই অবস্থায় খেলতে নেমে
শুরুতেই আবিদের দেওয়া গোলে মোহনবাগান পেছিয়ে পড়ে, মহামেডন ক্লাবের আক্রমণ যখন
ঢেউয়ের মত মোহনবাগানের ডিফেন্স এ আছড়ে পড়ছে ঠিক এই সময়ে কেষ্ট পালের সাজিয়ে দেওয়া
পাসে গোল শোধ করে মোহনবাগানের সমর দত্ত, এর পরেই কেষ্ট পালের বিখ্যাত হেডে মোহন
বাগান জেতে ২-১ গোলে, জিতে নেয় সেই বছরের লিগ। ফরওয়ার্ড লাইনে কেষ্ট পাল আর বদ্রু ব্যানার্জীর
জুড়ি সেই বছর মোহন বাগান কে আই এফ এ শিল্ড ও এনে দেয়।
১৯৫৫
সাল, এই বছরেও মোহন বাগান ওই একই তারকাখচিত মহামেডন ক্লাব কে হারিয়ে রোভারস কাপ
জেতে, জিতে নেয় পর পর দু বছর কলকাতা লিগ। এই জয়েরও অন্যতম সেরা কুশীলব কেষ্ট পাল।
১৯৫৬
সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কে পাল, অলিম্পিকে ভারত
চতুর্থ স্থান পায়, এই বছরেই মোহনবাগান তাদের শক্তিশালী দল নিয়ে ইন্দোনেশিয়া ও হংকং
সফরে যায় চার টি ম্যাচ খেলার জন্য , এই দলের অন্য সদস্যরা ছিলেন এস. চ্যাটার্জী,
এন গুহ, পি বরুয়া, সুশীল গুহ, শুভাশিস গুহ, রতন সেন, নরসিয়া , পরিমল মজুমদার,
বদ্রু ব্যানার্জী, চুনি গোস্বামী, সাত্তার, কেষ্ট পাল, কেষ্ট দত্ত, রমণ ও ইস্টার্ন
রেল থেকে ধার নেওয়া পি, কে ব্যানার্জী। এখানে চারটি ম্যাচে কেষ্ট পালের দেওয়া
গোলের সংখ্যা ১২ টি। প্রথম ম্যাচে পি এস পি ‘র বিরুদ্ধে কেষ্ট পাল হ্যাট্রিক করেন,
খেলা ৪-৪ গোলে ড্র হয়, পরের ম্যাচ ডায়নামো ক্লাবের বিরুদ্ধে কেষ্ট পালের আবার হ্যাট্রিক,
মোহনবাগান জেতে ৬-৪ গোলে, তৃতীয় ম্যাচে হংকং একাদশ কে মোহনবাগান হারায় ৬-৩ গোলে
কেষ্ট পালের গোল সংখ্যা ২, শেষ ম্যাচে হংকং অলস্টারের বিরুদ্ধে মোহন বাগান জেতে ৫-০ গোলে, এই খেলাতেও
আবার হ্যাট্রিক করেন কেষ্ট পাল। এই বছর আবার মোহনবাগান পরপর তিন বারের জন্য লিগ জয়
করে। ওপরের বিবরণ পড়ার পর নিশ্চয় বলার অপেক্ষা রাখে না ’৫৬ লিগ জয়ে কেষ্ট পালের
ভূমিকার কথা। এই ’৫৬ সালেই সেই বছরের খুবই ভালো দল এরিয়ান্স কে শিল্ড ফাইনালে ৪-০
গোলে হারিয়ে শিল্ড জেতে মোহনবাগান, সেখানেও আবার আবার হ্যাট্রিক কেষ্ট পালের।
১৯৫৭
সালে আই এফ এ একাদশের সদস্য হয়ে বার্মা ( মায়নামার) সফরে যান কেষ্ট পাল, এখানের
দুটি ম্যাচে তার গোল সংখ্যা ৫ টি তার মধ্যে বার্মা সার্ভিস টিমের বিরুদ্ধে ছিল
আবার একটা হ্যাট্রিক। খেলোয়াড় জীবনের শেষ প্রান্তে ১৯৫৯ সালে মোহন বাগান তার চির
প্রতিদ্বন্দ্বী ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব কে সব ডার্বি খেলার হারিয়ে লিগ জয় করে, এই বছরও
মোহনবাগানের নির্ভরযোগ্য সেন্টার ফরওয়ার্ড ছিলেন কেষ্ট পাল। প্রচার
বিমুখ কেষ্ট পাল কত বড় মাপের খেলোয়াড় ছিলেন সেই নিয়ে মন্তব্য করবার ন্যূনতম বাসনা
বা অধিকার আমার নেই। তার খেলোয়াড়ি জীবনের শেষ প্রান্তে আমার জন্ম, সুতরাং খেলা
দেখার সুযোগ আমার হয়নি, শুনেছি তার হেড করার দক্ষতা এতটাই নিখুঁত ছিল যে তিনি হেডে
গোল মিস করলে খবরের কাগজে খেলার পাতায় বড় বড় করে লেখা হত ‘কে পালের হেড লক্ষভ্রস্ট
হয়েছে’। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে আজ অবধি আর কোন ভারতীয় ফুটবলার তার খেলোয়াড়ি
জীবনে এতবার হ্যাট্রিক করেছেন কিনা। আরও জানতে ইচ্ছে করে এত বড় মাপের একজন মোহনবাগান
অন্ত প্রাণ খেলোয়াড় কে মোহনবাগান কেন মোহন বাগানের অধিনায়ক করেনি।
না
এই সব কুট কাচালি, ময়দানের রাজনীতি, বাঙালীর অকারণ বিস্মৃতির ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা
বা ব্যঙ্গ করতে চাইছি না, শুধু মাত্র এই ভেবে গর্ব করতে চাইছি যে পঞ্চাশের দশকের
ময়দান কাঁপানো এই মহান খেলোয়াড় আমাদের শ্যামনগরে জন্মেছিলেন, শ্যামনগরে বড়
হয়েছিলেন, শ্যামনগরে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আমাদের শ্যামনগরকে গৌরবান্বিত করতেই।
না
এই সব কুট কাচালি, ময়দানের রাজনীতি, বাঙালীর অকারণ বিস্মৃতির ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা
বা ব্যঙ্গ করতে চাইছি না, শুধু মাত্র এই ভেবে গর্ব করতে চাইছি যে পঞ্চাশের দশকের
ময়দান কাঁপানো এই মহান খেলোয়াড় আমাদের শ্যামনগরে জন্মেছিলেন, শ্যামনগরে বড়
হয়েছিলেন, শ্যামনগরে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আমাদের শ্যামনগরকে গৌরবান্বিত করতেই।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন